নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে একতরফা সিদ্ধান্তের অভিযোগ উঠতেই প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বললেন, ‘আমরা সবই জানি। খতিয়ে দেখব।’ কমিশনের দাবি, এসআইআর বা ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন সংক্রান্ত তিনটি প্রধান নির্দেশ সর্বসম্মতভাবে নেওয়া হয়েছে। অথচ দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অনুসন্ধানে দেখা গিয়েছে, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সঁধু ও বিবেক জোশী দশ মাসে অন্তত ১৪ বার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কাজের পদ্ধতি নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা নিয়ে এই বিরোধ এখন সুপ্রিম কোর্টে।
২৬ অক্টোবর জমা দেওয়া হলফনামায় কমিশন জানিয়েছে, ২০২৫ সালের জুন ও অক্টোবর এবং ২০২৬ সালের মে মাসের এসআইআর নির্দেশগুলি তিন সদস্যের সম্মতিতেই জারি হয়েছিল। তাদের যুক্তি, ফাইলে প্রশ্ন বা ভিন্নমত লেখা মানেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে বিরোধ নয়। নিয়মমাফিক আলোচনা ও অনুমোদনের পরেই নির্দেশ কার্যকর হয়। আবেদনকারীদের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ কার্যকর হওয়ার পরেও দুই কমিশনারকে তার অনুমোদন ও আইনি ভিত্তি জানতে চাইতে হয়েছে। তাহলে সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিধি কতটা মানা হয়েছিল?
সবচেয়ে স্পষ্ট বিতর্ক নতুন ভোটারের ফর্ম ৬ নিয়ে। জুলাইয়ে অনলাইন ফর্মের সঙ্গে এমন ঘোষণাপত্র যুক্ত হয়, যেখানে আগের নিবিড় সংশোধনের ভোটার তালিকায় নিজের বা পরিবারের নামের তথ্য চাওয়া হয়। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তি ছিল, সরকারি বিধি সংশোধন ছাড়া নির্ধারিত ফর্ম বদলানো যায় না। ২৬ সেপ্টেম্বর কমিশন দাবি করেছিল, এই ব্যবস্থার অনুমোদন দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। কিন্তু ৫ অক্টোবর আদালত জানায়, ফর্ম ৬-এর পরিবর্তন অনুমোদন করেনি তারা। নতুন হলফনামায় কমিশনের ব্যাখ্যা, মূল ফর্ম বদলানো হয়নি। পৃথক ঘোষণাপত্র অনলাইন ব্যবস্থায় এমনভাবে দেখানো হয়েছিল, যাতে ভুল বোঝার সুযোগ তৈরি হয়। ২১ অক্টোবর দুটি আলাদা করে দেখানোর সিদ্ধান্তও হয়েছে। কিন্তু আগের আপত্তি সত্ত্বেও এই ব্যবস্থা কার্যকর হল কার নির্দেশে?
বাংলার ভোটারদের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন গুরুতর। কমিশনের সেপ্টেম্বরের হিসাবে, এসআইআরে বাদ পড়া ভোটারদের নাম ফেরাতে ২২ লক্ষ ২১ হাজার আপিলের পাশাপাশি বিচারকদের অনুমোদিত ভোটারদের অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধেও ১৬ লক্ষ ১০ হাজার আপিল জমা পড়েছে। এই আপিল কারা অনুমোদন করেছিলেন, জানতে চেয়েছিলেন দুই কমিশনার। হলফনামায় কমিশন জানিয়েছে, রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তরের আধিকারিকেরা আইনি ক্ষমতায় আপিল করেছেন। বিষয়টি কমিশনের তিন সদস্যের কাছে পেশই হয়নি। কিন্তু প্রতিটি ভোটারের বিরুদ্ধে আপিলের কারণ ও যাচাইয়ের হিসাব এখনও প্রকাশ্যে স্পষ্ট নয়।
২৭ অক্টোবরের শুনানিতে আবেদনকারীদের আইনজীবী অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি কমিশনের ফাইল ও অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ সংরক্ষণের নির্দেশ চান। আদালত পৃথক নির্দেশ দেয়নি, তবে নথি পরীক্ষা করবে জানিয়েছে। জ্ঞানেশ কুমারকে সরানোর কোনও নির্দেশও দেওয়া হয়নি। হলফনামার জবাব দিতে দশ দিন সময় দিয়ে ১৭ নভেম্বর পরবর্তী শুনানি রাখা হয়েছে।
এদিকে ৩০ অক্টোবর দিল্লিতে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে প্রতীকী ‘জন-অভিশংসন’ কর্মসূচির কথা জানিয়েছে কংগ্রেস। রামলীলা ময়দানে অনুমতি না পাওয়ার অভিযোগে কর্মসূচি সরানো হয়েছে মল্লিকার্জুন খাড়গের বাসভবনে। আগামী ১ নভেম্বর মিছিলের পরিকল্পনাও জানিয়েছে দলটি। তবে ‘জন-অভিশংসন’ রাজনৈতিক প্রতিবাদ, সাংবিধানিক অপসারণ প্রক্রিয়া নয়।
এসআইআর নিয়ে কমিশনের সিদ্ধান্ত সরাসরি লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকারের সঙ্গে যুক্ত। সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশন সংক্রান্ত আইনের ১৮ ধারা অনুযায়ী, কমিশনের সিদ্ধান্ত যতদূর সম্ভব সর্বসম্মতভাবে নিতে হবে।
প্রশ্ন হল, তিন কমিশনারের সর্বসম্মতির দাবি যদি সত্যি হয়, তাহলে দুই সদস্যের লিখিত আপত্তির পরেও এত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ কার্যকর হল কীভাবে? ফর্ম ৬ থেকে বাংলার লক্ষ লক্ষ আপিল—কোন সিদ্ধান্ত কার অনুমোদনে নেওয়া হয়েছিল, তার পূর্ণাঙ্গ নথি কি আদালতে পেশ করবে নির্বাচন কমিশন? এমন নানা প্রশ্নই উঠছে বিরোধী শিবিরে।
তথ্যসূত্র: সুপ্রিম কোর্টে শুনানি, ৫ ও ২৭ অক্টোবর ২০২৬; নির্বাচন কমিশনের হলফনামা, ২৬ অক্টোবর ২০২৬; দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ২৩ সেপ্টেম্বর ও ২৭–২৮ অক্টোবর ২০২৬; লাইভল, ২৭ অক্টোবর ২০২৬; সুপ্রিম কোর্ট অবজ়ার্ভার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬; হিন্দুস্তান টাইমস, ২৮ অক্টোবর ২০২৬।

মন্তব্য 0